গুণীজনদের সম্মান জানানো মানে ভবিষ্যতের জন্য সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ
- আপলোড সময় : ২০-০৭-২০২৬ ১০:২০:০৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২০-০৭-২০২৬ ১০:২০:০৬ পূর্বাহ্ন
একটি সমাজের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার উন্নত সড়ক, দালানকোঠা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই সমাজ কতটা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করে, তার ওপরও নির্ভর করে। এই বিবেচনায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক পাঁচজন গুণীজনকে ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা ২০২৫’ প্রদান নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
জীবনের দীর্ঘ সময় শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে নিবেদিত মানুষদের অবদান অনেক সময় আলোচনার আড়ালে থেকে যায়। অথচ তাঁদের শ্রম, সাধনা ও সৃজনশীলতা একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তাঁদের রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, এটি সমাজের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সুনামগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই বাউল, লোকসংগীত, সাহিত্য, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক চর্চার এক সমৃদ্ধ জনপদ। হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, দুর্বিন শাহ, শাহ আবদুল করিমসহ অসংখ্য গুণীজনের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই জেলা। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রজন্মের গবেষক, শিল্পী, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্মানিত করা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এতে তরুণ প্রজন্ম শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আরও আগ্রহী হবে এবং সৃজনশীল কাজে আত্মনিয়োগের অনুপ্রেরণা পাবে।
গুণীজন সম্মাননা অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যথার্থই বলেছেন, গুণীজনদের স্বীকৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করবে। প্রকৃতপক্ষে একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিকাশ নির্ভর করে তার গুণীজনদের যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মানের ওপর। যাঁদের অবদানকে সমাজ মর্যাদা দেয়, তাঁদের পথ অনুসরণ করতেই নতুন প্রজন্ম উৎসাহিত হয়।
এবারের সম্মাননায় গবেষণা, সাংস্কৃতিক সংগঠন, আবৃত্তি, কণ্ঠসংগীত ও লোকসংগীত - বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। সম্মাননাপ্রাপ্ত সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী, সাংস্কৃতিক সংগঠক শাহ নূরজালাল, আবৃত্তিশিল্পী রুনা শাহীন আরা লেইছ, কণ্ঠশিল্পী মো. যোবায়ের বখত ও লোকসংগীত শিল্পী হীরা মোহন তালুকদারকে আমরা অভিনন্দন জানাই। পাশাপাশি পূর্বে ঘোষিত সম্মাননা গ্রহণ না করা বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শেরগুল আহমদকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা প্রদান করে উদারতা ও শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় দিয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির সংশ্লিষ্টগণ। এমন উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করে।
তবে গুণীজন সম্মাননা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবন, কর্ম ও অবদান নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা, তথ্য সংরক্ষণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাঁদের পরিচিতি তুলে ধরার উদ্যোগও নিতে হবে। একই সঙ্গে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নীরবে কাজ করে যাওয়া শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদেরও খুঁজে বের করে মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে। কারণ প্রকৃত প্রতিভা অনেক সময় প্রচারের আলো থেকে দূরেই অবস্থান করে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। গুণীজনদের সম্মান জানানো মানে কেবল অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ করা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়